বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ম্যান্ডেট বা দায়িত্ব মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এ লক্ষ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রা সরবরাহ, বৈদেশিক লেনদেন বিনিময়, সুদের হার নির্ধারণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মানানসই না করে বড় অঙ্কের অর্থ ছাপিয়ে সরকারকে দিয়েছে। এই ছাপানো টাকা আবার মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে। টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে টাকা ধার করায় সুদহার বেড়ে হয়েছে ১১ শতাংশ। সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি রোধ নিয়ে সন্দেহ আছে। সুদহার বৃদ্ধিতে উৎপাদন খাত ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিলে দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। ঋণ পরিশোধ করতে টাকার দরকার হবে। তখন মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। দ্বিতীয়ত, সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে প্রথমবারর মতো ঘাটতি বেড়ে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। পুঁজি পাচার, হাওলা ও হুন্ডি–সংক্রান্ত অভিযোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপও নিতে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা লাগামহীন।
মূল্যস্ফীতির চাপ লাঘবে অর্থ মন্ত্রণালয় তথা রাজস্ব নীতির বড় ভূমিকা থাকে। মানুষ দুর্দশায় নিমজ্জিত হলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় জীবনযাপন চালিয়ে নেওয়ার বিধান সারা পৃথিবীতেই আছে। কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা জাল ছিন্নভিন্ন, বিক্ষিপ্ত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য বেড়েছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলের কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ।
অযৌক্তিক প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোয় ঋণের পরিমাণও বেশ বেড়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব আয় বাড়েনি। বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার হার গত ১৪ বছরে বেড়েছে ৩২২ শতাংশ। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাওনার পাহাড় জমছে। ভর্তুকি ও প্রণোদনা পরিশোধের মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। কর ও মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতের দিক দিয়ে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান একেবারে তলানির দিকে। জিডিপি যা দেখানো হয়, সে অনুযায়ী বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এমনটা হওয়ার কথা নয়। সঞ্চয় হার কমে যাওয়ায় স্থবির হয়ে থাকা বিনিয়োগ আরও কমছে। আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান না বাড়ায় অনানুষ্ঠানিক খাতে সৃষ্ট কর্মসংস্থান কখনোই টেকসই হতে পারে না; বাইরের অভিঘাত মোকাবিলা করতে পারে না।
ইতিমধ্যে দুই জেনারেশন সর্বজনীন ও গুণগত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশিল্পায়ন ঠেকানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশল অনুপস্থিত। বর্তমানের ভোগ ব্যয়কেন্দ্রিক জিডিপি বৃদ্ধির মডেল থেকে বেরিয়ে দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকেন্দ্রিক টেকসই সবুজ প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত অগ্রযাত্রা অধরাই থেকে যাচ্ছে।