19.3 C
New York

সরকারি বরাদ্দের টাকা মাসের পর মাস মাদরাসা সভাপতি-সুপারের পকেটে!

Published:

সরকারিভাবে বরাদ্দ হওয়া কোনো টাকা ব্যাংক থেকে তুলে মাসের পর মাস নিজের কাছে রাখার নিয়ম নেই। সরকারি আইনজীবীদের মতে এ টাকা একদিনও নিজের কাছে রাখলে সেটা অপরাধ। অথচ চট্টগ্রামের হাটহাজারী মোহাম্মদীয়া বালিকা দাখিল মাদরাসায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ করা পাঁচ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে প্রায় পাঁচ মাসেও খরচ করা হয়নি।

নির্ধারিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনুদানের এসব টাকা মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ফরিদ আহমদ ও অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জানে আলম নেজামি পাঁচ মাস ধরে নিজেদের কাছে রেখেছেন। এর মধ্যে মাদরাসার অধ্যক্ষ নেজামি অন্য মাদরাসায় বদলি হয়ে যাওয়ার প্রায় দেড় মাস পর উত্তোলিত আংশিক টাকা পুনরায় ব্যাংক জমা দেন। এসব কাজে সভাপতি ও সুপারকে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে হাটহাজারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাঈনুদ্দিন মজুমদারের বিরুদ্ধে।

বিষয়টি জানাজানি হলে তড়িঘড়ি করে টাকা বিলি-বণ্টনের চেষ্টা করেন সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইডিপি) আওতাভুক্ত এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন পারফরম্যান্স বেজড গ্র্যান্টস ফর সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশন্স (পিবিজিএসআই) স্কিমের ‘স্কুল/মাদরাসা/কলেজ ব্যবস্থাপনা জবাবদিহি অনুদান’ হিসেবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোহাম্মদীয়া বালিকা দাখিল মাদরাসাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়, যা গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর একটি তফসিলি ব্যাংকের নাজিরহাট কৃষি/এসএমই শাখায় মাদরাসার নামে সভাপতি ও সুপারের যৌথ স্বাক্ষরের অ্যাকাউন্টে জমা হয়।

‘মোহাম্মদিয়া গার্লস দাখিল মাদরাসা’ নামে ওই ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সরকারি অনুদানের টাকা জমা হওয়ার চারদিনের মাথায় মাদরাসার সুপার জানে আলম নিজামির নামে ১০ হাজার টাকা তোলা হয়। ৯ অক্টোবর সুপারের নামে তোলা হয় আরও দুই লাখ টাকা। ১৮ অক্টোবর সভাপতি ফরিদ আহমেদের নামে দেড় লাখ এবং এক লাখ ৪০ হাজার টাকার দুই চেকে অনুদানের অবশিষ্ট ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা তোলা হয়।

ব্যাংক স্টেটমেন্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৪ ফেব্রুয়ারি ফরিদ আহমেদ ওই ব্যাংক হিসাবে দেড় লাখ টাকা জমা দেন। পরের ৮ ফেব্রুয়ারি জানে আলমের নামে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ওই হিসাবে জমা হয় আরও এক লাখ টাকা। দুই দফায় আড়াই লাখ টাকা জমা হলেও বাকি টাকা জমার বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অবশিষ্ট টাকার বিষয়ে কেউ সদুত্তরও দিতে চাননি।

 

সরকারি প্রকল্পের টাকা প্রকল্প কাজের ব্যয় ছাড়া একদিনও কারও হাতে রাখার সুযোগ নেই। রাখলে এটি আইনগত অপরাধ। এ নিয়ে দুদকে অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।- চট্টগ্রাম আদালতে দুদকের পিপি (আইন কর্মকর্তা) অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হক

 

প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, অনুদানের পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে ২০ শতাংশ হিসেবে এক লাখ টাকা ওই মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য প্রণোদনা, ২৫ শতাংশ হিসেবে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা বইপত্র, শিক্ষা উপকরণ, গবেষণাগার সরঞ্জাম কেনা এবং লাইব্রেরি উন্নয়নের জন্য, ৩০ শতাংশ হিসেবে দেড় লাখ টাকা ছাত্র-ছাত্রী বিশেষ করে ছাত্রীদের মাদরাসা ফ্যাসিলিটির (অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, কমনরুম, হাইজিন কর্নার) তৈরি, সংস্কার, উন্নয়ন খাতে, ২০ শতাংশ হিসেবে এক লাখ টাকা সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের (ভূমিহীন, গৃহহীন, অতিদরিদ্র, দুস্থ, এতিম, নদী সিকন্তি পরিবারের শিক্ষার্থী) সহায়তা এবং ৫ শতাংশ হিসেবে ২৫ হাজার টাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ফ্যাসিলিটি (হুইল চেয়ার, ক্র্যাচ, সাদাছড়ি, হিয়ারিং এইড, ব্রেইল বই ইত্যাদি সরবরাহ করা) উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত রয়েছে।

আরও পড়ুন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক থেকে টাকা তুলেও শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অনুদানের অর্থ বিলি করা হয়নি। এসব টাকা সভাপতি ও সুপার নিজেদের পকেটে রেখে দেন। এরই মধ্যে মাদরাসার সুপার জানে আলম নেজামি তার তোলা টাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বণ্টন না করেই ৩১ ডিসেম্বর মাদরাসা থেকে পদত্যাগ করে গত ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ইয়াকুবিয়া দাখিল মাদরাসার সুপার হিসেবে যোগ দেন।

সরকারি বরাদ্দের টাকা মাসের পর মাস মাদরাসা সভাপতি-সুপারের পকেটে!

মূলত জানে আলম নেজামির পদত্যাগের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ করা পাঁচ লাখ টাকা উত্তোলনের বিষয়টি জানতে পারেন মোহাম্মদীয়া বালিকা দাখিল মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এরপর ব্যাংক থেকে তোলা সরকারি টাকা তাদের অনুদান বিতরণ না করে মাদরাসা সুপার অন্যত্র চলে যাওয়ায় ভুক্তভোগী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাদের অর্থ পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ শুরু করেন।

এ বিষয়ে ওই মাদরাসার শিক্ষক পরিষদ সম্পাদক ও সহকারী মৌলভী হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ও সহকারী শিক্ষিকা (গণিত) মিসেস সাজেদা বেগম জাগো নিউজকে জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ করা পাঁচ লাখ টাকা সরকারি অনুদান উত্তোলনের অর্ধেক বছর পার হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পাননি। অথচ অনুদানের এসব টাকা মাদরাসার সাবেক সুপার জানে আলম নেজামি ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফরিদ আহমেদ দুই ধাপে আমাদের মাদরাসার নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তুলেছেন এবং পরবর্তীসময়ে নাকি তারা ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা হলে মাদরাসা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফরিদ আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি কোনো টাকা তুলিনি। সব টাকা সুপার তুলেছিলেন। তিনি আবার ওই টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন। আমরা টাকা ২৫ মার্চ বিতরণ করবো।’

এ বিষয়ে সাবেক সুপার জানে আলম নেজামি জাগো নিউজকে বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা টাকা তুলেছি। মাদ্রাসার বই কেনা, আসবাবপত্র বানাতে দিয়েছি। পরে আমি মাদরাসা থেকে চলে যাওয়ার কারণে এসব টাকা আবার ব্যাংকে জমা দিয়েছি। সভাপতির নামে তোলা টাকাও জমা দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘টাকাগুলো বিতরণের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় রয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসার আমাদের বলেছিলেন, সব টাকা ব্যয় করে একসঙ্গে ভাউচার জমা দেওয়ার জন্য।’

তবে ৩১ ডিসেম্বর পদত্যাগ করার পরেও কেন প্রকল্পের টাকা মাদরাসায় ফেরত দেওয়া হয়নি এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করলেও আর্থিক হিসাব বুঝিয়ে দেইনি। কিন্তু পরে প্রায় দেড় মাস আগেই টাকা জমা দিয়েছি। এসব কিছু শিক্ষা অফিসার জানেন।’ তবে কত টাকা জমা দিয়েছেন, তার হাতে প্রকল্পের আর কোনো টাকা আছে কি না? এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি তিনি।

সরকারি বরাদ্দের টাকা মাসের পর মাস মাদরাসা সভাপতি-সুপারের পকেটে!

সরকারি প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করে প্রায় ছয় মাস ব্যক্তি পকেটে রেখে দেওয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না? এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না? জানতে চাইলে হাটহাজারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মাঈনুদ্দিন মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। তারা টাকা পুনরায় ব্যাংকে জমা দিয়েছেন। এখন আমিও যাবো, টাকা ২৫ মার্চ বিতরণ করা হবে।’

চট্টগ্রাম আদালতে দুদকের পিপি (আইন কর্মকর্তা) অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারি প্রকল্পের টাকা প্রকল্প কাজের ব্যয় ছাড়া একদিনও কারও হাতে রাখার সুযোগ নেই। রাখলে এটি আইনগত অপরাধ। এ নিয়ে দুদকে অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আকতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘সরকারি টাকা নির্ধারিত বিল কিংবা খরচের বিপরীতে তুলতে হবে। ব্যাংক থেকে তুলে নিজের তহবিলে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এটি মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধ। এখানে সরকারি টাকা নিজের তহবিলে নেওয়ার কারণে দণ্ডবিধির ৪০৯ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ২ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার মাওলানা এনামুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের অনুদানের টাকা বুঝিয়ে না দেওয়ায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অভিযোগ দিয়েছিলাম। তারা এখনো আমাকে হিসাবটি বুঝিয়ে দেননি। এখন কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারি আছেন। তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। সোমবার অনুদানের টাকা বিতরণ করা হবে। বইখাতা ও আসবাবপত্রগুলো পরে কেনা হবে বলে আমাকে বলা হয়েছে।’

এমডিআইএইচ/এএসএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

Related articles

Recent articles

spot_img