10.4 C
New York

মুক্তিযুদ্ধের জন-ইতিহাস নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা | প্রথম আলো

Published:

এই যে বাংলাদেশের ইতিহাসের মহাকাব্যিক ঘটনা, যা ঘটেছিল আজ থেকে অর্ধশত বছরের বেশি সময় আগে, সে ঘটনার সবকিছু আমরা জানি না। অনেক পরম্পরা ও চিহ্নসূত্রও হারিয়ে ফেলেছি। মূল ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত অনেক উপঘটনা আমরা ভুলে গিয়েছি; ধরে রাখার প্রয়োজনও বোধ করিনি হয়তো। প্রয়োজনীয় অনেক নায়কোপম চরিত্র বিস্মৃতির অতলে চলে গেছে। আমরা এসবের যত খোঁজ করব, ততই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গভীর, সম্পূর্ণ ও বিস্তৃত হবে। আমাদের বর্তমান অবশ্যই একটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ঋদ্ধ করতে; বর্তমানকে একটা আরও শক্ত পটভূমির ওপর দাঁড় করানোর জন্য রাষ্ট্র, নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। প্রথমা প্রকাশন এই চর্চাযজ্ঞের অন্যতম শরিক।

যেখানে আলো পড়েনি

প্রথমা প্রকাশন প্রকাশনাজগতে প্রবেশ করে ২০০৯ সালে। এর মধ্যে বিচিত্র বিষয়-আশয় নিয়ে অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে এখান থেকে। ১৫ বছরের অভিযাত্রায় এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে শুধু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই-ই প্রকাশিত হয়েছে ৬৫টির মতো। গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৪টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই বের করা কম কথা নয়। প্রকাশনার এই পরিসংখ্যান বলে দেয়, সংস্থাটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণের প্রশ্নে আন্তরিকভাবে আগ্রহী। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শুধু নন–ফিকশন নয়, অনেক গল্প–উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে প্রকাশনাটি থেকে।

আদতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘ চর্চার ভেতর দিয়ে প্রথমা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণের অন্যতম অংশীজনে পরিণত হয়েছেও বটে।

প্রথমার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্বেষণের একটা বিশেষ চরিত্র আছে। যেখানে আলো পড়েনি, সেখানেই তারা আলো ফেলতে চায়। ইতিহাসের যেখানে অসম্পূর্ণতা ও অন্ধকার, সেখানেই প্রথমার নজর। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রথমা প্রকাশন থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস বইটির কথা। বইটি লিখেছেন কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান ও চিকিৎসাবিদ খায়রুল ইসলাম। আমরা মুক্তিযুদ্ধে কিছু চিকিৎসকের আত্মত্যাগের কথা জানি। এ–ও জানি যে কিছু কিছু চিকিৎসক কোথাও কোথাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়েছেন। তাঁদের আবার যুদ্ধের উপযোগী করে তুলেছেন। বহু সাধারণ মানুষকে তাঁরা জীবনের মধ্যে ফিরে আসতে সহায়তা করেছেন। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব বাংলার চিকিৎসাব্যবস্থাটা সামগ্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত ছিল, কীভাবেই–বা কাজ করেছে ওই সংকটকালে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও অপরাপর হাসপাতালগুলোর ভূমিকাটা কেমন ছিল, সেক্টরভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থাটা কেমন ছিল, শরণার্থীশিবিরের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়টা কারা কীভাবে মোকাবিলা করেছে—এসব বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ কোনো ইতিহাস আমরা জানি না। কোনো তরফেই এই অধ্যায়টির ওপর তেমন একটা আলো ফেলা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস বইটি ইতিহাসের ওই অনালোকিত দিকটিতে আলো ফেলেছে। ফলে উন্মোচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিন্ন একটি অধ্যায়।

ধরা যাক, মতিউর রহমান সম্পাদিত ১৯৭১: শিলিগুড়ি সম্মেলন বইটির কথা। বইটির সম্পাদক ভূমিকায় বলছেন, ‘১৯৭১ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হয় শিলিগুড়ি সম্মেলন, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য ছিল একটি নির্ধারক ঘটনা। এ সম্মেলনে গৃহীত নীতিমালা ও সিদ্ধান্তের আলোকে পরিচালিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল কর্মকাণ্ড।’ ৫ ও ৬ জুলাইয়ের ওই সম্মেলনে অল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও ইস্ট পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যসহ মোট ৪০০ জন প্রতিনিধি যোগ দেন। সম্মেলনটি সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৩ কোর সদর দপ্তরের ওপর। ‘সম্পাদকের কথা’ অংশে বইটির সম্পাদক জানাচ্ছেন, ‘এ সম্মেলনের পরপরই যোগদানকারীদের সঙ্গে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক আলোচনা আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে সৃষ্ট বিভ্রান্তি ও নেতৃত্বের কোন্দল দূর করে এবং নীতিনির্ধারণে সহায়তা করে, যা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ চলাকালে প্রয়োগ করা হয়। এতে দ্রুত যুদ্ধজয় নিশ্চিত হয়।’ কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে, এই সম্মেলন সম্পর্কে তেমন কোনো ইতিহাসসম্মত ঘাঁটাঘাঁটিই হয়নি। ঘাঁটাঘাঁটিই–বা বলি কেন, আদতে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা সম্পর্কে ‘বিশেষ কিছু জানাই সম্ভব হয়নি।’ প্রথমা ২০২২ সালে ওই সম্মেলনের কিছু ইংরেজি দলিল ও মূল্যায়নসহ ১৯৭১: দ্য শিলিগুড়ি কনফারেন্স নামে একটি ইংরেজি বই প্রকাশ করে। পাঠকচাহিদার দিকে লক্ষ করে বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। মুক্তিযুদ্ধের এই অজানা ইতিহাসের প্রতি মানুষের আগ্রহের মাত্রাটা বোঝা যাবে এই তথ্যে যে ওই একই মাসে নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ অনূদিত ও মতিউর রহমান সম্পাদিত বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে। এই মুদ্রণও শেষের পথে।

Related articles

Recent articles

spot_img