14.9 C
New York

বাংলাদেশের জন্মও পাকিস্তানকে বদলাতে পারেনি

Published:

শ্রীনাথ রাঘবন: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সমস্যা ছিল ভূখণ্ডগত—এই দুই রাষ্ট্রের সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে, জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে। জাতীয় পরিচিতি নিয়েও একধরনের প্রতিযোগিতা ছিল, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল মুসলমানদের আবাস হিসেবে। ভারত খুব সচেতনভাবেই দেশটিকে হিন্দুভিত্তিক করতে চায়নি। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভারতে কেমন হবে, তা-ও সেই চেতনার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

পাকিস্তানের সমস্যা ছিল একটি কেন্দ্রীভূত সংবিধান না থাকার। সংবিধান যখন তারা পেল, তত দিনে সামরিক শক্তি ক্ষমতা দখল করেছে, আর তার সব পরিণতিও সেই সঙ্গে চলে এসেছে। আসলে সমস্যাটা ছিল সামরিক বাহিনী জাতীয় ভূখণ্ডের দাবি করায়। তাতে আবার জাতীয় পরিচয় ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিন্নতাও যুক্ত ছিল। আমি মনে করি, একাত্তরে বাংলাদেশ সংকটের পরও পাকিস্তানের কোনো কিছুরই মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশের জনগণের চাওয়া ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ করার অধিকার। তারা নিজেদের দেশ গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু যেভাবে সেটা ঘটানো হয়েছে, তা ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে আরেকটি সংঘাতে টেনে নিয়ে গেছে। এই সংঘাতের মূল কারণ ভারতের স্বার্থে ছিল না। ৬ বছর আগের, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের দিকে দেখুন। ভারত পূর্বাঞ্চলে কোনো আক্রমণ করেনি।

একাত্তরের যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির সময়ে ভারত ও পাকিস্তান ঠিক করেছিল ওই সমস্যা শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান করা হবে না। এখনো ভারতে অনেকে মনে করেন, ভারতের উচিত ছিল, তখনই সুবিধামতো এসবের সমাধান করে ফেলা। আমি মনে করি, ইন্দিরা গান্ধী তখন যা ভেবেছিলেন, তা সঠিক ছিল। যেমন ভূখণ্ড ও জনগণের একটি বিশাল অংশ হারানোর পর পাকিস্তানকে অপমান করে অমন সমাধান করলে, সেটি তাদের মধ্যে ক্ষত হয়ে থাকবে। তাতে ভবিষ্যতে আরও সংঘাতের বীজ বোনা হয়ে যাবে এবং সেই সমাধান টিকবে না।

আরেকটি বিষয় হলো, আমরা ভারতীয়রা পুরোপুরি ভুলে গেছি যে কাশ্মীর সমস্যা কাশ্মীরিদেরই। এটা পাকিস্তানিদেরও জিজ্ঞেস করুন। কারণ, আমি তাঁদের হয়ে কথা বলতে পারি না। কাশ্মীরিরাই ঠিক করবেন কে তাঁদের নেতা হবেন, সিদ্ধান্ত নেবেন, বিষয়গুলো কীভাবে ঘটবে, যেমন ভারত ও পাকিস্তানে ঘটে। আমি বলতে পারি না যে ভারত সরকার সমাধানের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। কাশ্মীরের জনগণ সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন কি না, আমার কাছে তা পরিষ্কার নয়।

তাই আমি মনে করি, সিমলা চুক্তির সময় মিসেস গান্ধী পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি পাকিস্তানে সামরিক শক্তির প্রত্যাবর্তন চান না। তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ভারত যেন সংকটের ধকল কাটিয়ে ওঠার সময় পায় এবং অভ্যন্তরীণ ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে পারে। পারমাণবিক পরীক্ষা ও বিভিন্ন সংকটের কারণে ভারত-পাকিস্তান নিরাপত্তা সম্পর্কের উন্নতি হয়নি। পূর্বের অবস্থা বহাল রয়েছে। কাশ্মীরে বিদ্রোহের তীব্রতা হয়তো কিছু কমেছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৩৭০ ধারা উল্টে দিয়ে কাশ্মীরকে জোর করে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করবে। মোদ্দাকথা, এটা রাজনৈতিক সমস্যা। শুধু সাংবিধানিকভাবে, শুধু বল বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে এর সমাধান হবে না।

কাশ্মীর ও ভারতের মধ্যে এত যে সংঘর্ষ হয়েছে, তারপরও কী জনগণ তাঁদের অধিকার স্থগিত করে রাখার বা ভারতের আনুগত্য চিরদিনের জন্য বা দীর্ঘ সময়ের জন্য মেনে নেবেন। আমার মনে হয়, তার জবাব হচ্ছে, না। আমার ধারণা, ভারত সরকারও তা জানে। এ জন্য তারা বলে যে এর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে চায়। কাশ্মীরের জনগণের স্বার্থ সার্বিকভাবে রক্ষা না করলে ভারত-পাকিস্তান সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

আমেরিকার খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক স্টিভেন পি কোহেন তাঁর শেষ বই শুটিং ফর আ সেঞ্চুরি: দ্য ইন্ডিয়া-পাকিস্তান কনানড্রামে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ২০৪৭ সালেও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। দুর্ভাগ্য, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ক্রমেই অত্যন্ত সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এর কারণ, আমরা আবার পথ হারিয়েছি। সেখানকার বিশাল জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে। ভারত বা পাকিস্তানে কেউ কাশ্মীরের স্বাধীনতার কথা বলে না বলে তা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

বর্তমানে সেখানে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির জন্য উভয় প্রান্তে রাজনীতি ‘জমাট বরফ’ হয়ে গেছে। দুই পক্ষের মধ্যে কোনো আলোচনা না হলে ভবিষ্যতে খুব ভালো হবে না। এখন স্বল্প সময়ের জন্য যা শান্ত ও স্থিতিশীল বলে মনে হচ্ছে, তা বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে। আমরা মিত্রদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও বিদ্রোহের ক্ষেত্রে যাদের সাহায্য করেছি, তাদের চেয়ে ভারতের রাজ্যগুলো সেটা অনেক ভালো জানে। তাই আশা করি, আমরা অভিজ্ঞতা থেকে শিখব।

Related articles

Recent articles

spot_img