12.4 C
New York

ঢাকা দখলের অভিযান | প্রথম আলো

Published:

১৬ ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে অবস্থানরত সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পারি, পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। একটু পরে সে খবরের সত্যতা সরকারিভাবে জানতে পারি। আমার সৈন্যরা পায়ে হেঁটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদী হয়ে ডেমরা পৌঁছে এবং পথে পথে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করে স্বভাবতই ছিল ক্লান্ত ও দীর্ঘ পথযাত্রায় দুর্বল। তাই সকালে ডেমরার একটি বাড়িতে ভারী কামান ও গোলাবারুদ রেখে আমরা ডেমরার প্রধান সড়কে উঠি। আমাদের পরনে খাকি পোশাক। কারণ, যুদ্ধকালীন কোনো সৈন্য ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় না থেকে বেসামরিক পোশাকে যুদ্ধবন্দী হলে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবে না, বরং দুষ্কৃতকারী হিসেবে গণ্য হবে। তা ছাড়া শৃঙ্খলা এবং সার্বিক নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত বাহিনীর পোশাক থাকা একান্ত আবশ্যক। যাহোক, ডেমরা থেকে আমরা খাকি পোশাকে ডান দিকের রাস্তা ধরে যাচ্ছিলাম। বাঁ দিকের রাস্তায় দেখি, অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মেজর আমাকে জড়িয়ে ধরেন। তাঁর সঙ্গে আমি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে পরিচিত। ভগ্ন-মনোরথ মেজর আমাকে বোঝাতে চাইছিলেন যে তাঁর রেজিমেন্ট সাধারণ জনগণের ওপর কোনোরূপ নির্যাতনমূলক আচরণ করেনি। কোনোরূপ প্রত্যুত্তর না করে আমি আমার পথে ঢাকার দিকে চলতে লাগলাম। একটু পরে দেখি, ভারতীয় বাহিনী ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং মেজর হায়দারকে (পরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে নিহত) নিয়ে গাড়ি করে বেসামরিক পোশাকে ঢাকার দিকে যাচ্ছেন। এদিকে ওই দিনই এয়ার ভাইস মার্শাল আবদুল করিম খন্দকারও কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন মিত্রবাহিনীর সঙ্গে। ঢাকায় আত্মসমর্পণ ও অনুষ্ঠানের ছবিতেও তাঁদের দেখা যায়। উল্লেখ্য, ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং ১৯৮৪ সালের অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরের সংঘর্ষে ভারতীয় বাহিনীর হাতে মন্দিরের ভেতরে নিহত হন। ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ছিলেন উগ্রপন্থী শিখনেতা সন্ত ভিন্দ্রানওয়ালের সামরিক উপদেষ্টা।

সন্ধ্যার দিকে আমরা ঢাকা পৌঁছাই। রাস্তার দুই পাশের বাড়ির ছাদে অসংখ্য কৌতূহলী জনতা আমাদের স্বাগত জানায়। অনেকে অবশ্য আমাদের খাকি পোশাকে দেখে অবাক হয়। কারণ, আমাদের এবং পাকিস্তানি বাহিনীর উভয়ের পোশাক ছিল খাকি। ফলে তারা কিছুটা ভীতসন্ত্রস্তও ছিল। যাহোক, আমাদের চিনতে তাদের কিছুটা সময় লাগে।

সূত্র: ‘ভেতর থেকে দেখা সেনাবাহিনীর এক দশক, ১৯৭১–৮১: এক জেনারেলের নীরব সাক্ষি’, প্রথম আলো, ১ ডিসেম্বর ১৯৯৯

মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.): সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; মুক্তিযুদ্ধে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক

Related articles

Recent articles

spot_img