12.4 C
New York

গ্রামের তুলনায় শহরে অটিজম আক্রান্ত শিশু ২১ গুণ

Published:

 

অটিজম হচ্ছে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা। এতে আক্রান্ত শিশুর মাঝে সামাজিক যোগাযোগ, সামাজিক আচরণ ও সামাজিক কল্পনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা লক্ষ করা যায়। অটিজম কেন হয়, তার কারণ খুঁজতে সারাবিশ্বে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পাওয়া যায়নি। গবেষকরা জানিয়েছেন, এটি একটি জিনগত সমস্যা। পাশাপাশি পরিবেশগত কোনো সমস্যা থাকলে এর মাত্রা আরও বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা একে অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার বা এএসডি বলেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো পরিবারে একজন সদস্য অটিজম আক্রান্ত থাকলে ওই পরিবারে তার একটি তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে বাবা-মায়ের জীবন ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে এ সমস্যাকে শিশুর জিন-ভুতের আছরভুক্ত বলেও ধরা হয়। কিন্তু পুরো বিষয়টি আসলে তাদের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে ঘটে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুকে বছরের পর বছর সমাজের সবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হতো। সামাজিক কোনো আচার অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণ ছিল না। তবে এখন তা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। যদিও অটিজম আক্রান্ত শিশুরা এখনো বেশিরভাগই থাকছে চিকিৎসা বা শিক্ষার বাইরে। এক্ষেত্রে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি।

ঢাকার ৩ শতাংশ শিশু অটিজম আক্রান্ত
দেশে ঠিক কতজন শিশু অটিজম আক্রান্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ২০০৯ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, দেশে এক শতাংশ শিশু অটিজম আক্রান্ত। ২০১৩ সালের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, ঢাকা শহরে ৩ শতাংশ শিশু অটিজম আক্রান্ত। আর গ্রামে প্রতি সাতশো জনে একজন শিশু অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। সে হিসাবে গ্রামের তুলনায় শহরে অটিজম আক্রান্ত শিশুর হার ২১ গুণ বেশি।

jagonews24

দেশে নিবন্ধিত অটিজম শিশু ৮৬১৪২ জন
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলমান প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ অনুসারে, চলতি বছরের ১ এপিল পর্যন্ত দেশে অটিজম শিশুর সংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার ১৪২ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৫২ হাজার ৮৩৮ জন ও নারী ৩৩ হাজার ২৫০ জন। এছাড়া হিজড়া সম্প্রদায়ের রয়েছে ৫৪ জন। অর্থাৎ, অটিজম শনাক্তদের ৬১ দশমিক ৩৩ শতাংশই পুরুষ।

এমন পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও ২ এপ্রিল পালিত হবে ১৭তম ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘সচেতনতা-স্বীকৃতি-মূল্যায়ন: শুধু বেঁচে থাকা থেকে সমৃদ্ধির পথে যাত্রা’। দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার দৈনিক পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্মানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও আওতাধীন দপ্তর-সংস্থা ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নীলবাতি প্রজ্জ্বলন করা হবে। এছাড়া অটিজম বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে রোড-ব্র্যান্ডিং, বিশেষ স্মরণিকা ও লিফলেট ছাপানো হয়েছে।

দিবসটি পালন উপলক্ষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্রধান অতিথি থাকবেন। সভায় সভাপতিত্ব করবেন সমাজকল্যাণ সচিব মো. খায়রুল আলম সেখ।

ঠিক কতজন শিশু অটিজম আক্রান্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ২০০৯ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, দেশে এক শতাংশ শিশু অটিজম আক্রান্ত। ২০১৩ সালের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, ঢাকা শহরে ৩ শতাংশ শিশু অটিজম আক্রান্ত। আর গ্রামে প্রতি সাতশো জনে একজন শিশু অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। সে হিসাবে গ্রামের তুলনায় শহরে অটিজম আক্রান্ত শিশুর হার ২১ গুণ বেশি

দেশে ২০০৮ সাল থেকে শিশুদের অটিজম ও স্নায়বিক জটিলতা-সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর কাজ শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়ার কন্যা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অটিজম বিশেষজ্ঞ ড. সায়েমা ওয়াজেদ পুতুল। তার উদ্যোগে ২০১১ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো অটিজম-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যার সদরদপ্তর করা হয় বাংলাদেশে। তার চেষ্টাতেই বাংলাদেশে ‘নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅ্যাবিলিটি ট্রাস্ট অ্যাক্ট-২০১৩’ পাস করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা) বিভাগের অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু জাগো নিউজকে বলেন, অটিজমের কারণ জানতে আমরা বেশ কিছু গবেষণা করেছি। এতে দেখা গেছে, অটিজম মূলত জিনগত সমস্যা এবং পরিবেশগত কারণে এর মাত্রা বাড়ে। একসময় মনে করা হতো ভিটামিন ‘ডি’ এর ঘাটতির কারণে অটিজমের মাত্রা বাড়তে পারে। কিন্তু গবেষণায় এটির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া বায়ুতে সিসার মাত্রা নিয়ে গবেষণা করেছি, কিন্তু এটি অটিজমের কারণ হিসেবে সর্ম্পকযুক্ত মনে হয়নি। তবে বিভিন্ন জরিপে শহর অঞ্চলে অটিজমের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। এর কারণ হিসেবে শহরে পরিবেশগত কিছু সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়।

jagonews24

তিনি বলেন, ২০১৭ সালে বিএসএমএমইউয়ের অধীনে তিন বছরের কম বয়সী অটিজম শিশুদের ওপরে করা এক জরিপে দেখা গেছে, অটিজমের মাত্রা এক হাজারে ১৭ জন। অটিজম আক্রান্ত চারজন ছেলে হলে একজন মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে, অর্থাৎ ৪ অনুপাত ১। শহরাঞ্চলে এর মাত্রা বেশি এবং গ্রামে কম।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, অটিজম নিয়ে বাংলাদেশের একটি কর্মকৌশল রয়েছে। তাদের মূলধারায় নিয়ে আসতে সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সারাবিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অটিজম ও স্নায়বিক সমস্যাযুক্ত শিশুদের নিয়ে যে ধরনের পলিসি গ্রহণ করেছে তার বেশিরভাগের প্রস্তাবক ও উত্থাপক বাংলাদেশ। তবে পলিসির জায়গায় আমরা যতদূর এগিয়েছি কাজের জায়গায় ততোটা এগোতে পারিনি। আগামী দিনগুলোতে এ সংক্রান্ত যেসব পলিসি ও নীতিমালা রয়েছে তা বাস্তবায়ন হবে আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ।

অটিজম মূলত জিনগত সমস্যা এবং পরিবেশগত কারণে এর মাত্রা বাড়ে। একসময় মনে করা হতো ভিটামিন ‘ডি’ এর ঘাটতির কারণে অটিজমের মাত্রা বাড়তে পারে। কিন্তু গবেষণায় এটির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া বায়ুতে সিসার মাত্রা নিয়ে গবেষণা করেছি, কিন্তু এটি অটিজমের কারণ হিসেবে সর্ম্পকযুক্ত মনে হয়নি। তবে বিভিন্ন জরিপে শহর অঞ্চলে অটিজমের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। এর কারণ হিসেবে শহরে পরিবেশগত কিছু সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গড়ে প্রতি ১২৫ জন শিশুর মধ্যে ১ জন অটিজমের উপসর্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অটিজমের নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এর একাধিক কারণ রয়েছে। যার একটি মাল্টি ফ্যাক্টরিয়াল জিন ইনভারমেন্টাল ইন্টারেকশন। একজন মানুষের মাঝে অটিজমের বৈশিষ্ট্য থাকবে কি না তা জিনের মধ্যে নির্ধারণ করা থাকে। পরিবেশ যদি তার প্রতিকূলে থাকে সেটার জন্যও অটিজম দেখা দিতে পারে। কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশু কিংবা গর্ভাবস্থায় যে মায়েদের পুষ্টিহীনতা থাকে সেই গর্ভের শিশুদের অটিজমের ঝুঁকি বেশি থাকে। এটিকে একটি রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অটিজম লক্ষণ প্রকাশ পায় দেড় থেকে তিন বছরে
ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু বলেন, অটিজম আক্রান্ত শিশুর দেড় বছর বয়স থেকে কিছু লক্ষণ দেখা যায়। তিন বছরে এসে পুরোপুরি চিত্রটা প্রকাশ পায়। এসব শিশু অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে চায় না, একা থাকতে পছন্দ করে, একা একা নির্দিষ্ট কিছু জিনিস নিয়ে খেলতে পছন্দ করে।

‘স্বাভাবিক শিশুরা যে ধরনের খেলাধুলা করে, অটিজম আক্রান্তরা সে ধরনের খেলাধুলা করে না। অটিজম আক্রান্ত শিশুরা বোতল, ব্রাশ কিংবা কাগজের টুকরো নিয়ে খেলাধুলা করে। এ ধরনের শিশুদের নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় কম, চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। তারা বেশি রাতে ঘুমাতে চায়। এদের হজমের অসুবিধা থাকে। কখনো কখনো তারা অধিক পরিমাণে হাইপার থাকে। অনেক সময় কারও কারও খিঁচুনি ও মৃগী রোগ দেখা দেয়’- বলেন তিনি।

jagonews24

শিশুর অটিজম আছে কি না জানতে করণীয়
ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু বলেন, নির্দিষ্ট বয়সে শিশুর নির্দিষ্ট বিকাশ হচ্ছে কি না, বিষয়টি গুরুত্বসহ খেয়াল রাখা জরুরি। যেমন- এক বছরের একটি শিশু এতটুকু কথা বলার কথা, দুই বছরের শিশু এতটুকু কথা বলার কথা, এসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ, ধাপে ধাপে শিশুর যে বিকাশটা হওয়ার কথা সেটা হচ্ছে কি না; এজন্য শিশু বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাঝে মাঝে শিশুর পরীক্ষা করাতে হবে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা অটিস্টিক শিশুদের লাল পতাকা দ্বারা চিহ্নিত করেন।

নির্দিষ্ট বয়সে শিশুর নির্দিষ্ট বিকাশ হচ্ছে কি না, বিষয়টি গুরুত্বসহ খেয়াল রাখা জরুরি। যেমন- এক বছরের একটি শিশু এতটুকু কথা বলার কথা, দুই বছরের শিশু এতটুকু কথা বলার কথা, এসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ, ধাপে ধাপে শিশুর যে বিকাশটা হওয়ার কথা সেটা হচ্ছে কি না; এজন্য শিশু বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাঝে মাঝে শিশুর পরীক্ষা করাতে হবে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা অটিস্টিক শিশুদের লাল পতাকায় চিহ্নিত করেন

‘একটি শিশু দেড় মাস বয়সে প্রথম মায়ের দিকে তাকিয়ে বড় করে হাসি দেয়, কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেও যদি কোনো শিশু তার মায়ের দিকে তাকিয়ে না হাসে, তাহলে সেই শিশুকে লাল পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। ছয় মাস বয়সে একটি শিশু বাবলিং (বাববাব্বা) সাউন্ড করে। এক বছরের মধ্যে যদি শিশুর কোনো বাবলিং সাউন্ড না আসে এবং শিশুটি যদি তার প্রয়োজন আঙুল দিয়ে নির্দেশ না করে তাহলে এটিকেও লাল পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।’

‘এছাড়া এক বছরের শিশু একটু একটু কথা বলে। যেমন- বাবা, দাদা ও মামা। কিন্তু দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে যদি একটি শিশু এ শব্দগুলো না বলতে পারে এবং দুই বছরের একটি শিশু যদি দুই শব্দকে একসঙ্গে বলতে না পারে তাহলে ওই শিশু লাল পতাকা চিহ্নিত হবে। এক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে’- বলেন ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু।

অটিজমের চিকিৎসা
এ রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব নয়। কারণ, এটি জেনেটিক। আবার অন্যদিকে রোগীর তুলনায় চিকিৎসাসেবাও অপ্রতুল। প্রথমে রোগটি নির্ণয় করতে হবে। এ ধরনের রোগীদের মধ্যে কিছু হাইপার অ্যাক্টিভিটি (অতিরিক্ত চঞ্চলতা) থাকে। খাওয়ার অসুবিধা থাকে। হজমের অসুবিধে থাকে, খিঁচুনি থাকে। এ ধরনের রোগের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকই যথেষ্ট। তবে এ রোগগুলোর কিছু ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য একজন সাইকোলজিস্ট ও একজন স্পিচ থেরাপিস্টের প্রয়োজন হয়।

এএএম/এমকেআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

Related articles

Recent articles

spot_img