13.2 C
New York

একাত্তরে কেন ফিরে যাই | প্রথম আলো

Published:

তিন

প্রতিবছর ২৫ মার্চ গভীর হওয়ার পর বাতাসে কান পাতলে কালরাত্রির নানা শব্দ শোনা যাবে। সেই রাত একদিকে ছিল বীভৎসতায় মোড়ানো। অন্যদিকে অসংখ্য মানুষের জীবন মুহূর্ত-সময়ে হারিয়ে যাওয়া, স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার আঘাতে বিপর্যস্ত। কিন্তু সেই রাতের গায়ে শহীদেরা তাঁদের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কথাটি লিখে দিলেন। ২৫ মার্চের রাতজুড়ে যে দীর্ঘশ্বাস, কান্না, ক্রোধ ও প্রতিজ্ঞার গর্জন শোনা গিয়েছিল, একাত্তরজুড়ে চলল তার পুনরাবৃত্তি। গর্জনের শব্দ শত্রুকে বিচলিত করল, তাদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে নিয়ে গেল। শত্রুরা ইতিহাসটিকে তাদের মতো করে তৈরি করে নিতে চেয়েছিল। সেই কাজে তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশ্বক্ষমতাও আস্তিন গুটিয়ে নেমেছিল। কিন্তু একাত্তরের অন্তঃস্রোত তার সলিলসমাধি ঘটাল।

একাত্তরে আমি ফিরে যাই সেই অন্তঃস্রোতের উৎসমুখটি আরেকবার দেখে আসতে। অন্তঃস্রোতটি যদি অনুভব করা যায়, তাহলে এটি কোথায় আমাদের নিয়ে যাবে, কোন সে কালমোহনায়, তা–ও অনুমান করা যাবে। তবে সেই স্রোত যাদের সেই মোহনায় নিয়ে যাবে, তারা যদি দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকে, নানা রকম রঙিন পর্দায় দৃষ্টি মেলে, অপরাজনীতির চোরাবালিতে সেঁধিয়ে গিয়ে, তাকেই নিয়তি মেনে, নিষ্ফল তর্কে শক্তি ক্ষয় করে, তাহলে সেই স্রোত বয়ে যাবে কার জন্য? একাত্তরে বাংলাদেশের ভূগোল আর ইতিহাস, জীবন আর জলবায়ু ছিল এক এবং অবিভাজ্য কিছু ভগ্নাংশ মানুষ এবং তাদের আলাদা ইতিহাস, জলবায়ু ইত্যাদি বাদ দিলে। মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ছিল স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষার ঘোরতর ঘাটতি ছিল। কিন্তু একটা জায়গায় তারা ছিল এক এবং তা স্বাধীনতার প্রশ্নে। শীর্ণ বাহু, বলহীন এসব মানুষ এস এম সুলতানের মানুষদের মতো পেশিবহুল আর সবল হয়ে উঠল, কোন সে রসায়ন? একাত্তরে ফিরে গেলে আমি বুঝি, সেই রসায়ন তৈরি করেছিল নেতৃত্ব, যার উদাহরণ তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তাঁর চার সহযোগী এবং অন্যান্য মানুষের অজটিল জীবনপ্রবাহ, রাজনীতির তুলনামূলক সুস্থতা, বাইরে থেকে আসা নানা মতাদর্শের অনুপস্থিতি, স্বার্থপরতা আর লোভের মাত্রা ছাড়িয়ে না যাওয়া।

সময়টা আগে থেকেই কোনো স্বর্ণযুগ ছিল না, দেশটাও কোনো ইউটোপিয়া ছিল না। কিন্তু সময়টা ছিল হাতে হাত রেখে উঠে দাঁড়ানোর। ওই একটা সময়ই। এবং ওই সময়টাই তৈরি করে দিয়েছিল একাত্তরের অন্তঃস্রোত। মানুষগুলো নেই অথবা তাদের বৃহৎ অংশই নেই, কিন্তু স্রোতটা আছে। দুঃখের বিষয়, এই স্রোতটাকে খুঁজে নেবে, তেমন মানুষ এখন আর নেই।

এ সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যেকেই যেন নিজের হাতটা নিজের কাছে রেখে দিচ্ছে, অন্যের দিকে বাড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছা কারও নেই। যদি দিতেই হয়, সেটি ভেবে হাতের গোপনে একটা ছুরি রেখে দিচ্ছে।

Related articles

Recent articles

spot_img